বিস্তারিত

কুরবানীর গুরুত্ব - তাৎপর্য ও সংক্ষিপ্ত ইতিহাস:

08 আগস্ট  ট্যাগ:  প্রবন্ধ


বিসমিল্লাহ হিররহমানির রহীম                                           
মহান প্রেমের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের দারপ্রান্তে আমরা উপস্থিত, নিজেদের সবচে প্রিয় বস্তুটি করুনাময়ের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করার অমিয় শিক্ষা নিয়ে এল পবিত্র কুরবানী। আল্লাহর জন্য কুরবানী করা হযরত আদম আ. এর যামানা থেকেই প্রচলিত।
ঐ সময় মানুষ কুরবানী করে মাঠে রেখে আসত, যার কুরবানী আল্লাহর দরবারে কবূল হত আসমান থেকে আগুন এসে তার কুরবানী করা পশু জ্বালিয়ে দিত।
আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রিয় বান্দাদের থেকে কুরবানী নিতেন। সে ধারাবাহিকতায় জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম আ. কে আদেশ করেছিলেন তাঁর প্রাণাধিক পুত্র ইসমাইলকে কুরবানী করার।
জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম আ. কঠোর পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন, তিনি সে পরীক্ষা শতভাগ উতীর্ণ হয়েছিলেন। মহান আল্লাহ তা’আলা খলীলুল্লাহর সেই অমর প্রেম কাহিনীকে আমলী রূপ দিয়ে আমাদের মাঝে জীবন্ত করে রেখেছেন। খলীলুল্লাহ হযরত ইবরাহীম আ. ইরাকের অধিবাসী ছিলেন। সেখান থেকে হিযরত করে শাম-সিরীয়ায় চলে আসেন, সেখানেই জন্মগ্রহণ করেন তাঁর প্রাণাধিকপুত্র হযরত ঈসমাইল আ.। স্তন্যপায়ী ঈসমাইলকে নিয়ে সুদূর মক্কায় হিযরতের আদেশ হল আল্লাহর তরফ থেকে। সাথে সাথে খলীলুল্লাহ গোলামীর জিঞ্জীর কাঁধে তুলে নিয়ে রওয়ানা হলেন। সাথে রাহবার হিসেবে ছিলেন হযরত জিবরাইল আ., রাস্তায় কোথাও কোন জনবসতী দেখলে জিজ্ঞাসা করতেন আমাকে কি এখানেই অবস্থান করতে হবে? জিবরাইল আ.উত্তরে না বলতেন। বিরামহীন সফর করে পৌঁছে গেলেন সেই জায়গায় যেখানে ছিল আল্লাহর ঘর ‘কাবা’। সেখানে আম্মাজান হাজিরা রা. ও শিশু ঈসমাইল আ.কে রেখে তিনি আবার শাম-সিরিয়ায় চলে আসেন। যখন ঈসমাইল আ. একটু বয়স্ক হন এবং ঈসমাইল আ.এর ব্যাপারে ইবরাহীম আ.এর যে আশা ছিল যে, আল্লাহ তা’আলার বন্দেগীর ব্যাপারে সহযোগী হবেন, ঠিক এমন সময় স্বপ্নযোগে তাঁকে আদেশ দেয়া হলো যে, ইসমাইলকে জবেহ কর। সে ঘটনাটি আল্লাহ তা’আলা আমাদের জন্যে তার কালামে জীবন্ত করে রেখেছেন, ইরাশাদ হচ্ছে-
رب هب لي من الصالحين (১০০) فبشرناه بغلام حليم (১০১) فلما بلغ معه السعي قال يا بني إني أرى في المنام أني أذبحك فانظر ماذا ترى قال يا أبت افعل ما تؤمر ستجدني إن شاء الله من الصابرين (১০২) فلما أسلما وتله للجبين (১০৩) وناديناه أن يا إبراهيم (১০৪) قد صدقت الرؤيا إنا كذلك نجزي المحسنين (১০৫) إن هذا لهو البلاء المبين (১০৬) وفديناه بذبح عظيم (১০৭)

অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! আমাকে একটি নেককার সন্তান দার করুন। এরপর আমি তাকে এক সহনশীল সুপুত্রের সুসংবাদ দান করি। পরে যখন সে তার পিতার সঙ্গে কাজ করার বয়সে উপনীত হলো, তখন ইবরাহীম (আ.) বলল, ‘হে আমার বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, আমি তোমাকে কুরবানী করছি, এখন তোমার অভিমত কি জানাও’।
 পুত্র বলে, ‘হে পিতা! আপনার প্রতি যে নির্দেশ হয়েছে তা আপনি পালন করুন, ইনশা-আল্লাহ আপনি আমাকে সবর অবলম্বনকারীদের অন্তর্ভূক্ত পাবেন’। এরপর যখন উভয়ে আল্লাহ তা’আলার আনুগত্য প্রকাশ করে, তখন ইবরাহীম (আ.) তার পুত্রকে কাত করে  শায়িত করলেন। তখন আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম, ‘হে ইবরাহীম’!। তুমি অবশ্যই স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ, নিশ্চয় আমি এভাইে নেককার লোকদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি।
নিশ্চয় এটা ছিল  প্রকাশ্য পরীক্ষা এবং আমি তাকে ইসমাইলের পরিবর্তে একটি বিরাট জন্তু জবেহ করতে দেই। আর আমি এ বিষয়টি পরবর্তী লোকদের স্মরণে  রেখে দিয়েছি।

উম্মতে মুহাম্মাদীকে কুরবানীর নির্দেশ:
কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। সামর্থ্যবান নর-নারীর উপর কুরবানী ওয়াজিব। এটি মৌলিক ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। আদম আ. থেকে সকল যুগেই কুরবানী ছিল। তবে তা আদায়ের পন্থা এক ছিল না। শরীয়তে মুহাম্মাদীর কুরবানী মিল্লাতে ইবরাহীমীর সুন্নত। সেখান থেকেই এসেছে এই কুরবানী। এটি শা‘আইরে ইসলাম তথা ইসলামের প্রতীকি বিধানাবলির অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং এর মাধ্যমে শা‘আইরে ইসলামের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এছাড়াও গরীব-দুঃখী ও পাড়া-প্রতিবেশীর আপ্যায়নের ব্যবস্থা হয়। আল্লাহ ও তাঁর রসূলের শর্তহীন আনুগত্যের শিক্ষা রয়েছে কুরবানীতে। তাই ইরশাদ হচ্ছে-
فَصَلِّ لِرَبِّك وَانْحَرْ ﴿
সুতরাং আপনার রবের জন্য নামায আদায় করুন এবং কুরবানী করুন।
অন্য আয়াতে এসেছে-
قُلْ إنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
 অর্থ: (হে রাসূল!) আপনি বলুন, আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ (অর্থাৎ আমার সবকিছু) আল্লাহ রাববুল আলামীনের জন্য উৎসর্গিত।
পশু জবাই করে কুরবানী করার মধ্যে এই হিকমত ও ছবকও আছে যে, আল্লাহর মুহববতে নিজের সকল অবৈধ চাহিদা ও পশুত্বকে কুরবানী করা এবং ত্যাগ করা। সুতরাং কুরবানী থেকে কুপ্রবৃত্তি দমনের জযবা গ্রহণ করা উচিত। তাই কুরবানীর মধ্যে ইবাদতের মূল বিষয় তো আছেই, সেই সাথে তাকওয়ার অনুশীলনও রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-
لَن يَنَالَ اللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِن يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنكُمْ
অর্থ: মনে রেখো, কুরবানীর জন্তুর গোশত অথবা রক্ত আল্লাহর কাছে কখনোই  পৌঁছে না; বরং তাঁর কাছে কেবলমাত্র তোমাদের পরহেযগারিই পৌঁছে।
কুরবানীর ফাযাইল:

খলীলুল্লাহ পুত্র কুরবানীর অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। পিতা-পুত্রের এ কুরবানী আল্লাহর কাছে এতোটাই পছন্দ হয়েছে যে, তাঁর পিয়ারা হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর উম্মতের উপর ওয়াজিব করে দিলেন।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল র. হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম রা. থেকে বর্ণনা করেন-
عن زيد بن أرقم رضى الله عنه قال قلنا : يا رسول الله ما هذه الأضاحى؟ قال : سنة أبيكم إبراهيم عليه السلام. قال قلنا : فما لنا فيها؟ قال : بكل شعرة حسنة  قال قلنا : يا رسول الله فالصوف قال : بكل شعرة من الصوف حسنة.
তিনি বলেন, সাহাবাগণ রাসূল সা.  কে জিজ্ঞেস করলেন, ওগো আল্লাহর নবী! কুরবানী কী? অর্থাৎ, কেন আমরা কুরবানী করি? তিনি বললেন:
-এটা তোমাদের পিতা ইবরাহীম আ. এর সুন্নত ও স্মৃতি। তাঁরা পুণরায় জিজ্ঞাসা করলেন: হে আল্লাহর রসূল সা. আমাদের এতে লাভ কি? রসূল সা. বললেন: কুরবানীর পশুর প্রত্যেক লোমের পরিবর্তে একটি করে নেকী  রয়েছে। তাঁরা আবার জিজ্ঞাসাকরলেন: হে আল্লাহর রসূল সা.! দুম্বা ও ভেড়ার পশমের কি হবে?  (অর্থাৎ ভেড়ার
তো পশম বা  লোম অনেক তার লোমের পরিমাণও কি ছাওয়াব দেয়া হবে?) রসূল সা. বললেন: ভেড়ারও প্রতিটি লোমের (পরিবর্তে) এক একটি ছওয়াব রয়েছে।

হযরত ইবনে উমার থেকে বর্ণীত-
عن بن عمر قال أقام رسول الله صلى الله عليه وسلم بالمدينة عشر سنين يضحي
অর্থ: রসূল সা. দশ বছর মদীনায় অবস্থান করেন। প্রতি বছর তিনি কুরবানী করতেন।

হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণীত-
عن عائشة أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال ما عمل آدمي من عمل يوم النحر أحب إلى الله من إهراق الدم إنها لتأتي يوم القيامة بقرونها وأشعارها وأظلافها وأن الدم ليقع من الله بمكان قبل أن يقع من الأرض فطيبوا بها نفسا
অর্থ: রসূল সা. বলেছেন, কুরবানীর দিনে বনী আদম এমন কোনো কাজ করতে পারে না, যা আল্লাহর নিকট রক্ত প্রবাহিক করা ( অর্থাৎ কুরবানী করা) অপেক্ষা অধিক প্রিয়। কুরবানীর সকলপশু তাদের শিং, পশম ও খূরসহ কিয়ামতের দিন উপস্থিত হবে। আর কুরবানীর পশুর রক্ত জমিনে পড়ার পূর্বেইতা আল্লাহ দরবারে পৌছে যায় ( অর্থাৎ কবুল হয়ে যায়,সুতরাং তোমরা প্রফুল্লচিত্তে কুরবানী কর।
হযরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণীত-
عن أبي هريرة أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال من كان له سعة ولم يضح فلا يقربن مصلانا
অর্থ: রসূল সা.বলেছেন: -“যে ব্যক্তি কুরবানী করার সামর্থ থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের ধারে কাছে ও না আসে”।
কার উপর কুরবানী করা য়াজিব?

কি পরিমাণ মাল হলে কুরবানী করতে হবে তা মহান আল্লাহ তা’আলা পক্ষ থেকে নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, আর এর নির্ধারিত পরিমাণকেই শরীয়তের পরিভাষায় ‘নিসাব’ বলে।
নিসাব:
আর নিসাব হল সোনার ক্ষেত্রে সাড়েসাত (৭.৫) ভরি, আর রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি।
সাহেবে নিসাব:
এই নিসাব পরিমাণ সোনা বা রূপা অথবা সমমূল্যের নগদ টাকা যে ব্যক্তির কাছে থাকবে তাকে সাহেবে নিসাব বা নিসাবের মালিক বলা হবে।
 উল্লেখ্য যে, বর্তমান বিশ্ববাজারে রূপার মুল্য স্বর্ণের মূল্যের তুলনায় অতি কম হওয়ায় নেসাবের ক্ষেত্রে রূপার মূল্যই ধর্তব্য হবে। প্রত্যেক দেশে সেখানকার বাজার মূল্য ধর্তব্য হবে।
টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব:

 টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হল সাড়েবায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা, কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে, কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর
কুরবানী করা ওয়াজিব। যেমন কারো নিকট কিছু স্বর্ণ ও কিছু টাকা আছে, যা সর্বমোট সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্য সমান হয় তাহলে তার উপরও কুরবানী করা ওয়াজিব।

কুরবানীর দিন:
 
কুরবানীর দিনগুলো হল ১০, ১১, ১২ই জ্বিলহজ্ব। প্রত্যেক সুস্থ, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থবিবেক সম্পন্ন, মুকীম, মুসলমান নর-নারীর উপর  উক্ত দিনগুলোতে কুরবানী করা ওয়াজিব, তবে তাকে নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হতে হবে।
১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কেউ যদি প্রয়োজন-অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয় তাহলে তার উপরও কুরবানী করা ওয়াজিব। যে কোন দিন কুরবানী করতে পারবে। তবে প্রথম দিন করাই উত্তম। অজ্ঞাতভাবে, অলসতায় বা অন্য কোন ওজর বশত যদি কারো কুরবানী নির্দিষ্ট দিনগুলো অতিবাহিত হয়ে যায় এবং কুরবানী করতে না পারে, তাহলে অভাবী ও মিসকীন ব্যক্তিকে কুরবানীর সমমুল্য সাদক্বা করে দিবে। কিন্তু কুরবানীর দিনগুলোতে কুরবানী না করে তার মূল্য সাদকা করলে কুরবানী আদায় হবে না। কেননা, কুরবানী একটি স্বতন্ত্র ইবাদত। নামায পড়লে যেমন রোযা আদায় হয় না, তদ্রুপ সাদকা করলেও কুরবানী আদায় হয় না।
টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বর্তমানে বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজনে আসে না এমন জমি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাড়ী, ব্যবসায়িকপণ্য ও অপ্রয়োজনীয়সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।
নেসাবের মেয়াদ:

কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরী নয়; বরং কুরবানীর তিন দিন থাকলে এমনকি ১২ তারিখ সূর্যাস্তের কিছু আগে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েগেলেও কুরবানী ওয়াজিব হবে।
কুরবানীর জন্তু ও তার বয়স :

(ক) উট, মহিষ, গরু, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা (নর-মাদা) এই কয় প্রকার গৃহপালিত জন্তু দ্বারা কুরবানী করা জায়েয।
(খ) উটের বয়স কমপক্ষে পাঁচ বছর হতে হবে।
(গ) গরু, মহিষের বয়স কমপক্ষে দুই বছর হতে হবে।
(ঘ) বকরী, ভেড়া এবং দুম্বার বয়স কমপক্ষে পূর্ণ এক বছর হতে হবে। হাঁ; যদি ভেড়া ও দুম্বার বয়স এক বছর থেকে কম হয় কিন্তু এমন মোটা-তাজা হয় যে, এক বছরের প্রাণীদের মধ্যে ছেড়ে দিলেও তাদের চেয়ে ছোট মনে হয় না । তাহলে তার কুরবানী জায়েয আছে, তবে অন্তত ছয়মাস হতে হবে। কিন্তু বকরী যতই মোটা-তাজা হউক না কেন তার এক বছর পূর্ণ হওয়া জরুরী; একদিন কম হলেও কুরবানী জায়েয হবে না।

এক পশুতে শরীকের সংখ্যা:

মাসআলা:একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কুরবানী দিতে পারবে। আর উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাতজন শরীক হতে পারবে। সাতের অধিক শরীক হলে কুরবানী সহীহ হবে না।
عَنْ جَابِرٍ رَضِىَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ : خَرَجْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- مُهِلِّينَ بِالْحَجِّ فَأَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- أَنْ نَشْتَرِكَ فِى الإِبِلِ وَالْبَقَرِ كُلُّ سَبْعَةٍ مِنَّا فِى بَدَنَةٍ. رَوَاهُ مُسْلِمٌ فِى الصَّحِيحِ عَنْ أَحْمَدَ بْنِ يُونُسَ.

হযরত জাবির রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা. আমাদেরকে নির্দেশ করেছেন যে, আমরা একটি গরু এবং একটি উটে সাতজন করে শরীক হয়ে যাই।
মাসআলা: সাতজনে মিলে কুরবানী করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারো অংশ যেন এক সপ্তমাংশের কম না হয়। যেমন কারো আধা ভাগ, কারো দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানীই সহীহ হবে না।
মাসআলা: উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয়ভাগে কুরবানী করা জায়েয।
মাসআলা: যদি কেউ আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কুরবানী না করে শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কুরবানী করে তাহলে তার কুরবানী সহীহ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে শরীকদেরও কারো কুরবানী হবে না। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীক নির্বাচন করতে হবে।
কুরবানীর পশুতে আকীকার অংশ:

মাসআলা: কুরবানীর গরু, মহিষ ও উটে আকীকার নিয়তে শরীক হতে পারবে। এতে কুরবানী ও আকীকা দুটোই সহীহ হবে। ছেলের জন্য দুই অংশ আর মেয়ে জন্য এক অংশ নিতে হবে।
মাসআলা: শৈশবে আকীকা করা না হলে বড় হওয়ার পরও আকীকা করা যাবে। যার আকীকা সে নিজে এবং তার মা-বাবাও আকীকার গোশত খেতে পারবে।
দ্রষ্টব্য:
কেউ কেউ কুরবানীর পশুর সাথে আকীকা দিলে আকীকা সহীহ হবে না বলে মত দেন। কিন্তু নির্ভরযোগ্য আলেমগণ এ মতটি গ্রহণ করেননি। কোনো হাদীসে কুরবানীর সাথে আকীকা করতে নিষেধ করা হয়নি; বরং কুরবানীর সাথে হজ্বের কুরবানী, জরিমানা দম একত্রে এক পশুতে দেওয়ারও প্রমাণ আছে। অর্থাৎ কুরবানীর পশুতে অন্য ইবাদতের নিয়তে শরিক হওয়া জায়েয। সুতরাং আকীকার নিয়তে শরিক হওয়াও জায়েয। আতা ইবনে আবী রবাহ রাহ. বলেছেন, উট-গরু সাতজনের পক্ষ হতে কুরবানী হতে পারে। আর এতে শরিক হতে পারে কুরবানীকারী, তামাত্তু হজ্বকারী এবং হজ্বের ইহরাম গ্রহণের পর হজ্ব আদায়ে অপারগ ব্যক্তি।

মাসআলা: কুরবানী করতে হবে সম্পূর্ণ হালাল সম্পদ থেকে। হারাম টাকা দ্বারা কুরবানী করা সহীহ নয় এবং এক্ষেত্রে অন্য শরীকদের কুরবানীও সহীহ হবে না।
যে সমস্ত পশু দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নেই:

ক. অন্ধ, কানা বা খোঁড়া জানোয়ার কুরবানী করা জায়েয নয়।
খ. পশু যদি এমন রগ্ন ও দুর্বল হয় যে, কুরবানীর স্থান পর্যন্ত পায়ে হেঁটে যেতে পারে না, তাহলে এমন জানোয়ারের     কুরবানী জায়েয হবে না।

গ. জন্তুর কান বা লেজ এক তৃতীয়াংশ বা তার চেয়ে বেশি কেটে গিয়ে থাকলে, তার দ্বারা কুরবানী দুরস্ত নয়।
ঘ. যে পশুর মোটেও দাঁত নেই, কিংবা অধিকাংশ দাঁত পড়ে গেছে, তার দ্বারা কুরবানী করা যাবে না। যদি অধিকাংশ     দাঁত বিদ্যমান থাকে, তাহলে কুরবানী জায়েয হবে।
ঙ. যে পশুর শিং উঠেইনি, কিংবা উঠেছিল কিন্তু উপর থেকে ভেঙ্গে গেছে, তার কুরবানী জায়েয। কিন্তু একেবারে মূল     থেকে ভেঙে গিয়ে থাকলে, কুরবানী দুরস্ত নয়।
চ. যে জানোয়ারের খুঁজলি বা চর্মরোগ হয়েছে, যদি এর প্রতিক্রিয়া গোশত পর্যস্ত পৌঁছে গিয়ে থাকে, তবে কুরবানী     দুরস্ত নয়, অন্যথায় দুরস্ত আছে।
ছ. যে মাদী জানোয়ারের স্তন নেই, কিংবা স্তন আছে কিন্তু শুকিয়ে গেছে অথবা শক্তি বৃদ্ধির জন্য ঔষধের মাধ্যমে     শুকিয়ে ফেলা হয়েছে, তাহলে এরূপ পশু দ্বারা কুরবানী দুরস্ত হবে না।
কুরবানীর গোশতের হুকুম:

মাসআলা: কুরবানীর গোশত সবাই খেতে পারে। নিজে খাবে, আত্মীয়-স্বজনকে দিবে এবং গরিব-মিসকিনদের মাঝে বন্টন করে দিতে পারে। যদি সম্পূর্ণ গোশত নিজে খায়, তবুও নাজায়েয হবে না। তবে উত্তম হল কুরবানীর গোশতকে তিন ভাগ করবে, এক ভাগ স্বয়ং নিজের ও পরিবার-পরিজনের জন্য রাখবে, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনকে এবং এক ভাগ ফকির-মিসকিনদের মধ্যে বিলিয়ে দিবে। অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশ ফকির-মিসকিনদেরকে দেয়া মুস্তাহাব। তবে কেউ যদি সম্পূর্ণ গোশত নিজেই খায় বা দান না করে, তাও জায়েয আছে।
মাসআলা:যদি কুরবানী মানতের না হয় তাহলে সবাই সেই কুরবানীর গোস্ত খেতে পারবে। কুরবানীল গোস্ত মুজুরী হিসাবে দেওয়া জায়েয নেই।
মাসআলা: কুরবানীর পশু যবেহ করে তার বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয আছে। বরং বিনিময় নেয়াটা যবেহকারীর হক। তবে সেই বিনিময় কুরবানীর গোশত বা চামড়ার দ্বারা লেনদেন করা নিষেধ। অবশ্য কেউ যদি আল্লাহর ওয়াস্তে অন্যের জন্তু যবেহ করে দেয় তাহলে এটা তার জন্য উত্তম।

মাসআলা: হালাল প্রাণীর আটটি অংশখাওয়া নিষেধ। যথা- পুরুষ লিঙ্গ, স্ত্রী লিঙ্গ, মূত্র থলি, পিঠের হাড়ের ভিতরের মগজ বা সাদা রগ,  চামড়ার নিচের টিউমারের মতো উঁচু গোশত, অ-কোষ, পিত্ত ও প্রবাহিত রক্ত।
উল্লেখ্য যে, শুধু প্রবাহিত রক্ত খাওয়া হারাম, আর অবশিষ্টগুলো মাকরূহে তাহরীমী।
মাসআলা: শরীকে কুরবানী করলে ওজন করে গোশত বন্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েয নয়।
চামড়ার হুকুম:

মাসআলা: কুরবানীর পশুর চামড়া শুকিয়ে বা প্রক্রিয়াজাত করে নিজেও ব্যবহার করা জায়েয। কুরবানীর চামড়া দান খয়রাতও করা যায়। বিক্রিও করা যায়, তবে বিক্রি করলে সে টাকা নিজে ব্যবহার করা যায়না, দান করে


দেওয়াই জরুরী এবং ঠিক ঐ টাকাই দান করতে হবে। ঐ টাকা নিজে খরচ করে অন্য টাকা দান করলে আদায় হবে, তবে অন্যায় হবে।
মাসআলা: কুরবানীর চামড়ার দাম নির্মাণ কাজে, বেতন বাবত বা পারিশ্রমিক বাবত খরচ করা জায়েয নয়। যে সমস্ত মাদরাসায় লিল্লাহ বোর্ডিং আছে, সেসব মাদরাসায় লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে দেওয়াতে সওয়াব বেশী হবে বলে উলামায়ে কেরাম বলে থাকেন। কারণ, এতে দানের সওয়াবও পাওয়া যাবে এবং দ্বীনি ইলমের খেদমত করার সওয়াবও পাওয়া যাবে।  আল্লাহ তা’আলা আমাদের আমল করার তাওফীক দান করুক। আমীন।


রচনায়:
আব্দুল আহাদ
উস্তাদ, থানাঘাট মাদরাসা, শাহজাদপুর-সিরাজগঞ্জ

 

 


আপনার মন্তব্য লিখুন


Graveter Image

নাম

April 12