বিস্তারিত

তাফসীর শাস্ত্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ

24 নভেম্বর  ট্যাগ:  প্রবন্ধ

 

অভিধানিক অর্থ: অভিধানিক  দৃষ্টিকোন থেকে তাফসীর (تفسیر)  শব্দের অর্থ স্পষ্ট করা, প্রকাশ করা, প্রসারিত করা, ব্যাখ্যা করা, যেমন যেমন আল্লাহর বাণী: -وَلَا يَأْتُونَكَ بِمَثَلٍ إِلَّا جِئْنَاكَ بِالْحَقِّ وَأَحْسَنَ تَفْسِيرًا

“ তারা আপনার কাছে কোন সমস্যা উপস্থাপন করলেই আমি তার সঠিক জওয়াব  ও ব্যাখ্যা প্রদান করি।  تفسیر শব্দটি  فسر শব্দমূল হতে গৃহত। যার অর্থ, উদঘাটন করা, উন্মুক্ত করা।স্পষ্ট করা। লিসানুল আরব প্রণেতা বলেন: الفسر  অর্থ, বয়ান তথা স্পষ্ট ব্যাখ্যা, যেমন বলা হয়: فسرہ অর্থাৎ স্পষ্ট করেছে। অতঃপর তিনি বলেন:  الفسر  অর্থ পর্দা উন্মোচন আর তাফসীরের কাজ হলো, অস্পষ্ট শব্দের মূল তত্ত্ব উদঘাটন করা।  মূলত ر - س- ف  ও ر - ف- س এই উভয় শব্দ মূল উন্মুক্তকরণ ও যবনিকা উন্মোচনের অর্থে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ر - ف- س শব্দমূল সাধারণত বাহ্য ও জড় বস্তুর উন্মোচন অর্থে এবং ر - س- ف অভ্যন্তরীণ ও অজড় বস্তুর উন্মোচন অর্থে ব্যবহৃত হয়। ডাক্তার যেভাবে রোগীর বাইরের অবস্থা দেকে অভ্যন্তরীণ অবস্থা অনুধাবন করেন সে অনুধাবন করাকে তাফসীর বলা হয়।  প্রকৃতপক্ষে ইহা() শব্দের সমর্থক।  এমনিভাবে তাফসীর শব্দটি বিজ্ঞান ও দর্শন শাস্ত্র সম্পর্কিত গ্রন্থের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। যেমন এরিস্টটল-এর রচনাবলীর গ্রীক ও আরবী ভাষ্যসমূহের ক্ষেত্রে ইহা সচরাচর ব্যবহৃত হয়। ঊঘঈণঈখঙচঅঊউওঅ ঙঋ ওঝখঅগ এর ঞধভংরৎ শিরোনামে এসেছে,    “ ওঃ রং ৎবমঁষধৎষু ধঢ়ঢ়ষরবফ ঃধভংরৎ  ঃড় ঃযব এৎববশ ধহফ  অৎধনরশ পড়সসবহঃধৎরবং ড়হ অৎরংঃড়ঃষব ” যথা- বানাস আর রুমী “ অষ গধমবংঃধ”(المجسطی)-এর  উপর এবং ইউক্লিড-এর  দশম পুুস্তকের উপর (ওয়াফা) “উরড়ঢ়াবহঃবং” এর রচনা, সনা‘আতুল জাবর (صناعۃ الجبر) এর  খাওয়ারযেমী “ অষ মবনৎধ”  ( کتاب الجبر والمقابلۃ)  এর উপর প্রসিদ্ধ চিকিৎসক আল-রাযী প্লেটোর “ ঞরসধবংি’ ( طیماوس) এর উপর তাফসীর রচনা করেন।   অতএব, বলা যায় তাফসীর শব্দটি বিভিন্ন পরিভাষাকে শামিল করলেও ইসলামী পরিভাষায় একে একটি বিশেষ ক্ষেত্রে তথা কুরআনের ব্যাখ্যার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। তাফসীরের পারিভাষিক অর্থ:  ইসলামী পরিভাষায় তাফসীর শব্দটির সংজ্ঞা সম্পর্কে আলিমগণ বৈচিত্রময় বক্তব্য পেশ করেছেন।ড. মুহাম্মদ হুসাইন যাহবী র. বলেন: কোন কোন আলিমের মতে তাফসীর এমন কোন বিদ্যানয়, যার সংজ্ঞা নির্ধারণে কেউ কষ্ট-সাধনায় নিমগ্ন হবে। কেননা ইহা এমন কোন নিয়মনীতি বা যোগ্যতা নয়, যা বিশেষ কিছু নিয়মনীতি চর্চা করতে করতে এক ধরণের যোগ্যতা সৃষ্টি হয়। যেমন আকলী বা বুদ্ধিগত চর্চার মাধ্যমে অনেক জ্ঞানের প্রসার ঘটে, জ্ঞানের শাখার উৎপত্তি হয়।তাফসীর প্রত্যয়টি ব্যাখ্যায় এটা বলাই যথেষ্ট যে, " بیان کلام اللہ  او انہ المبین لالفاظ القران و مفھوماتھا " আল্লাহর কালামের ব্যাখ্যা, অথবা এটা আল-কুরআনের শব্দ ও ভাবসমূহ সুস্পষ্টকারী।  আল্লাম জুরজানী র. তাঁর আততা‘রীফাত ( التعریفات ) নামক গ্রন্থে  তাফসীরের সংজ্ঞায় বলেন: তাফসীর হলো: توضیح معنی الایۃ وشانھا وقصتھا والسبب الذی نزلت بلفظ یدل دلالۃ ظاھرۃ “আয়াতের অর্থ , এর পেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট ঘটনা এবং আয়াত অবতীর্ণের কারণকে স্পষ্ট নির্দেশিত শব্দের মাধম্যে ব্যাখ্যাকরা”  আল্লামা যারাকাশী রা.তাফসীর শাস্ত্রকে একটি বিজ্ঞান হিসাবে আখ্যা দিয়ে বলেণ: ھو علم یعرف بہ فھم کتاب اللہ المنزل علی نبیہ محمد صلی اللہ علیہ و سلم وبیان معانیہ واستخراج احکامہ وحکمہ

  “ ইহা এমন এক বিজ্ঞান যার দ্বারা মুহাম্মদ সা. এর উপর অবতীর্ণ আল্লাহর কিতাব অনুধাবন , তার অর্থের ব্যাখ্যা ও আয়াতের বিধি-বিধান এবং রহস্য জানা যায়”।   আল্লামা তাশ কুবরা যাদাহ র. বলেন:  ھو علم عن معنی نظم القران بحسب الطاقۃ البشریۃ وبحسب ماتقتضیہ القواعد العربیۃمبادئہ العلول  العربیۃ واصول الکلام واصول الفقہ والجدل وغیر ذلک من العلوم الجملۃ۔

মানুষের সামর্থের ভিত্তিতে এবং আরবী ব্যাকরণ ও মৌলিক জ্ঞান-বিজ্ঞান যেমন  আরবী ভাষা জ্ঞান, কালাম শাস্ত্র, তর্কশাস্ত্র ইত্যাদির ভিত্তিতে আল-কুরআনের আয়াতের অর্থ জানা যায় এমন বিজ্ঞানের নাম হলো তাফসীর।  কাশফুয যুনূনের  লেখক হাজী খলীফা র. ও এ সংজ্ঞাটি গ্রহণ করেছেন।  বর্তমান যুগের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী চিন্তাবিদ প্রফেসর আল্লামা যারকানী আল-আযহারী এর সংজ্ঞায় বলেন:

  ھو علم یبحث فیہ عن احوال القران الکریم من حیث دلالتہ علی مراد اللہ تعالی بقدر الطاقہ البشریۃ۔

   “তাফসীর এমন এক বিজ্ঞান, যা আয়তে বর্ণিত  আল্লাহর উদ্দেশ্য নির্ণয়ে মানুষের সামর্থ্যানুযায়ী কুরআন কারীমের বিভিন্ন অবস্থা নিয়ে আলোচনা করে। 

উৎপত্তি

উলূমুল কুরআন বা কুরআনিক বিজ্ঞানসমুহের মধ্যে সর্বপ্রথম ইলমে তাফসীর  বা তাফসীর বিজ্ঞানের অভ্যুদয় ঘটে। আর এটা নুযূলে কুরআন ও ওহী  শুরু হওয়ার সাথে সাথেই। কেননা দেখা যায় যে, কুরআন কারীমের কোথাও যা সংক্ষেপে এসেছে, অন্যস্থাসেন তা বিস্তরিত এবং কোথাও শর্তহীনভাবে কোন হুকুম এসেছে. যা অন্য  স্থানে শর্তযুক্ত করে বর্ণনা করা হয়েছে।আবার কোনটি আম বা সাধারণভাবে এসেছে, অন্যস্থানে খাস বা সীমিত তথা নির্দিষ্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে।আর এটাই প্রকৃত পক্ষে বয়ান ও তাফসীর। এ কারণেই আল্লাহ তা’আলা ঘোষনা করেন:  ان علینا بیانہ “অতঃপর আমার উপরই তার বায়ান বা বর্ণনা কারা দয়িত্ব” কাজেই এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ পাক হলেণ সর্বপ্রথম কুরআনের ব্যাখ্যাকারী । এমনিভাবে সাহাবায়ে কেরাম রা. কুরআন কারীমের অস্পষ্ট  আয়াতসমূহের ব্যাপারে প্রশ্ন করতেন এবং নবীজী স. কুরআন কারীমের অর্থ ও হুকুম সম্বন্ধে বর্ণনা দেিতন। বরং নবী করীম স.-এর নবুয়তের সর্বপ্রধান দায়িত্ব ছিল মানব জাতিকে আল-কুরআনের ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে সৎপথ, কল্যাণের  পথের দিক-নির্দেশনা দেয়া।আল-কুরআনে এ বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।  যেমন ইরশাদ হচ্ছেঃ

هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ

“ তিনিই সেই সত্তা যিনি নিরক্ষর জনগোষ্ঠীর মাঝে এমন এক রাসূল প্রেরণ করেন, যিনি তাঁর আয়াতসমূহ তাদের মাঝে তেলাওয়াত করেন, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন  এবং আল-কুরআন ও সুন্নত শিক্ষা দেন।  আরো ইরশাদ হচ্ছে:

وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ وَلَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ

“ আমি আপনার প্রতি এক স্মরণিকা (কিতাব) অবতীর্ণ করেছি, যেন তা আপনি মানুষের জন্য বয়ান তথা ব্যাখ্যা করে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেন যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে।  কাজেই তাফসীরের উৎপত্তি হয় নবী করীম সা.এর যুগে, তাঁর উপর ওহী নাযিল হওয়ার সাথে সাথেই। যদিও মহানবী সা. প্রথম ব্যাখ্যাকারী ছিলেন না, কেননা প্রথম মুফাসসির ও ব্যাখ্যাকারী হলেন আল্লাহ তা’আলা স্বয়ং। কিন্তু ড. সুবহী সালিহের কথা দ্বারা এটা বোঝা যায় যে, তাফসীর শুরু হয় নবীজী সা.এর মুবারক যুগেই।

উৎপত্তির ধরণ ও পর্যায়সমূহ

পূর্বের আলোচনা দ্বারা একথা প্রতীয়মান হয় যে, তাফসীর মহান আল্লাহর বর্ণনা দ্বারা গোড়াপত্তন  হয়। তারপর নবী করীম সা.-এর বর্ণনা দ্বারা। কাজেই সূচনায় তাফসীর শাস্ত্র দু’টি পর্যায়ে বিকাশ লাভ করে।প্রথম পর্যায় কুরআন কারীমের আয়াত সমূহকে বিষয়ভিত্তিক একত্রিত করলে দেখা যাবে, এর কিছু কিছু এক স্থানে সংক্ষিপ্ত, তা আবার অন্য স্থানে বিস্তারিত এবং যা এক স্থানে শর্তহীন , তা অন্যস্থানে শর্তযুক্ত,এভাবে বিভিন্ন ধরণ বিদ্যমান।এমনি ভাবে এক আয়াত দ্বারা অন্য আয়াতের তাফসীর করা হয়, যা মুফাসসিরগণের নিকট কুরআনের তাফসীরের ক্ষেত্রে অতি পরিচিত বিষয়।এদিকগুলো ক’টি উদাহরণ নিচে আলোচিত হলো-প্রথম সংক্ষিপ্ত আয়াতকে বিস্তারিত আয়াত দ্বারা তাফসীর করা। যেমন আদম আ. ও ইবলীসের মাঝে সংঘটিত ঘটনার আলোচনা। হযরত মূসা আ.এবং  ফিরাউনের ঘটনা বর্ণনা যা কোথাও সংক্ষিপ্তরূপে এসেছে আবার কোথাও বিস্তারিত ভাবে বর্ণিত হয়েছে।দ্বিতীয়ত: বাহ্যত অস্পষ্টকে আরো স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যেমন আল্লাহর বাণী: وَإِنْ يَكُ صَادِقًا يُصِبْكُمْ بَعْضُ الَّذِي يَعِدُكُمْ

 “আর যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে সে যে শাস্তির কথা বলছে তার কিছু না কিছু তোমাদের উপর পড়বেই।  আর এ আয়াত উদ্দেশ্য হলো দুনিয়ার আজাব, যেমন কুরআনে মহান আল্লাহর বাণী:

 فَإِمَّا نُرِيَنَّكَ بَعْضَ الَّذِي نَعِدُهُمْ أَوْ نَتَوَفَّيَنَّكَ فَإِلَيْنَا يُرْجَعُونَ 

“ অতঃপর আমি কাফিরদেরকে যে শাস্তির ধমকি দেই তার কিয়াদংশ যদি আপনাকে দেখিয়ে দেই অথবা আপনার প্রাণ হরণ করে নেই সর্বাবস্থায় তারা তো আমার কাছে ফিরে আসবেই”।  এমনিভাবে আল্লাহর বাণী: فَتَلَقَّى آدَمُ مِنْ رَبِّهِ كَلِمَاتٍ  “অতঃপর তার প্রভুর নিকট হতে কতিপয় বাণী গ্রহণ করলেন”।   এর ব্যাখ্যা আসসে আল্লাহর বাণীতে যাতে হযরত আদাম আ. কে কিছু বাণী শিক্ষা দেয় এভাবে رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنْفُسَنَا

“হে প্রভূ! আমরা আমাদের নিজের উপর যুলূম করেছি”।  তৃতীয়ত মুতলাক (শর্তহীন)আয়াতকে মুকাইয়্যিদ (শর্তযুক্ত) আয়াত দ্বারা ব্যাখ্যা করা। আর ইহা তখনই প্রযোজ্য, যখন মুতলাক থেকে মুকাইয়্যিদ করার দলীল পাওয়া যায়। অন্যথায় উভয়ে স্ব স্ব অবস্থানে বহাল থাকবে। আল্লামা যারকাশী র. বলেন “মুতলাককে মুকাইয়্যিদ করার ব্যাপারে দলীল পাওয়া যায়, তবে তাই হবে। অন্যথায় নয়।বরং তখন মুতলাক ও মুকাইয়্যিদ নিজ অবস্থায় থাকবে।  এমনিভাবে কিছু মুতলাক আয়াতকে মুকাইয়্যিদ দ্বারা তাফসীর করা হয়। উলামার নিকট ইহার দৃষ্টান্ত হলো আয়াত যিহার (ایۃ القتل) কে আয়াত (ایۃ الظھار) এর দ্বারা তাফসীর করা। যিহারের কাফফারা সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা সূরা মুজাদালায় বলেন: দাস মুক্ত করার কথা।আল্লাহ পাক বলেন: “ فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ ”  আর কতলের কাফফারা

প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক সূরা নিসায় বর্ণনা করেন: মুমিন দাস মুক্ত করা। অর্থাৎ কাফফারা স্বরূপ যে দাস মুক্ত করা হবে তাকে মুমিন হতে হবে।ইরশাদ হচ্ছে: فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُؤْمِنَةٍ     কাজেই প্রথম মুতলাক আয়াতকে পরবর্তী মুকাইয়্যিদ আয়াত দ্বারা তাফসীর করা হয়।  চথুর্ত  ‘ আম (সাধারণত) আয়াতসমূহকে খাস (নিদিষ্ট) আয়াতসমূহ দ্বার তাফসীর করা। কুরআনে বর্ণিত আম আয়াত হলো ‘  وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ“ তালাক প্রাপ্তা নারী তিন কুরু অপেক্ষা করবে”।   তিন কুরু (হায়ায) ইদ্দত পালন করতে হবে। ইহা অন্য আয়াত দ্বারা খাস করা হয়েছে। তা হলো: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا نَكَحْتُمُ الْمُؤْمِنَاتِ ثُمَّ طَلَّقْتُمُوهُنَّ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَمَسُّوهُنَّ فَمَا لَكُمْ عَلَيْهِنَّ مِنْ عِدَّةٍ تَعْتَدُّونَهَا “ হে ঈমানদারগণ যখন তোমরা মুমিন নারীকে বিবাহ করবে এবং স্পর্স করার পূর্বে তারাক দিবে তখন তাদের জন্যে কোন ইদ্দত পালন করতে হবে না।  পঞ্চমত: যেই বিষয়টি বিভিন্নভাবে বর্ণিত হওয়ায় তাতে সন্দেহ থেকে যায়, সেগুলোর মাঝে সমন্বয় সাধন করা।যেমন: হযরত আদম আ. এর সৃষ্টি সম্বন্ধে কয়েকটি বর্ণনা পাওয়া যায়। এক আয়াতে (تُرَابٍ)মাটি,  দ্বারা সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহর বাণী: إنَّ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ اللَّهِ كَمَثَلِ آدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ “ নিশ্চয়  ঈসা এর দৃষ্টান্ত আল্লাহর নিকট হযরত আদম-এর মত, যাকে তিনি মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন”।  অন্য এক আয়াতে (طِينٍ) শব্দের উল্লেখ রয়েছে। যেমন আল্লাহর বাণী: إِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلاَئِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَراً مِّن طِينٍ “ স্মরণ করুন , যখন আপনার প্রভু ফেরেশতাদেরকে বলেছিলেন, আমি মাটি দ্বারা মানুষ সৃষ্টি করব”।   অন্য আয়াতে আসচে পচা কর্দমের কথা। যেমন আল্লাহর বাণী: وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِنْ صَلْصَالٍ مِنْ حَمَإٍ مَسْنُونٍ “ আপনার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদেরকে বললেন আমি পচা কর্দম থেকে তৈরি বিশুদ্ধ  ঠনঠনে মাটি দ্বারা সৃষ্টি একটি মানব জাতির পত্তন করবো”।  অন্য আয়াতে পোড়া মাটির কথা উল্লেখ আছে। যেমন আল্লাহর বাণী: خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ صَلْصَالٍ كَالْفَخَّارِ “ তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন পোড়া মাটির ন্যায় শুষ্ক মৃত্তিকা থেকে”।  উপরোক্ত আয়াতসমূহে হযরত আদম আ.এর সৃষ্টির সূচনা থেকে রুহ ফুকিয়ে দেয়া পর্যন্ত বিভিন্ন স্তর আলোচনা করা হয়েছে।ষষ্ঠত: কিরাআত বা তিলাওয়াত পদ্ধতি । কেননা আয়তের মধ্যে একটি কিরাআতকে অন্য কিরাআত দ্বার তাফসীর করা হয়। যেমন হযরত ইবনে মাসউদ রা.হতে বর্ণিত  তিনি, يَوْمَ يَقُولُ المُنَافِقُونَ وَالْمُنَافِقَاتُ لِلَّذِينَ آمَنُوا انظُرُونَا “ যেদিন মুনাফিক পুরুষ ও নারীরা ঈমানদারগণকে বলবে, আমাদের দিকে দৃষ্টি দিন”।  এর ব্যাখ্যায়   انظروناامرھا لوناآخرونا     আমাদের দিকে দৃষ্টি  ফিরান আমাদেরকে অবকাশ দিন,   ইত্যাদি ইত্যাদি পাঠ করতেন। এ প্রসঙ্গে ড. গোল্ড যিহর তাঁর কিতাব الاتجھات فی تفسیر القران الکریم   -এর উল্লেখ করেন যে, কুরআন কারীমের তাফসীরের প্রথম স্তরটা কুরআন কারীমের আয়াত দ্বারা শুরু হয়।আর অন্যদিকে তার বিভিন্ন কিরাত দ্বারাও তাফসীর শুরু হয়।  কাজেই নিঃসন্দেহে আমারা বলতে পারি যে, কুরআন কারীমের তাফসীলর প্রথম শুরু হয় একটি আয়াতকে অন্য আয়াত দ্বারা স্পষ্টকরণের মাধ্যমে। দ্বিতীয় পর্যায় কারামুল্লাহর তাফসীর দ্বিতীয় স্তরটা শুরু হয় নবী করীম সা.-এর পবিত্র মুখ নিঃসৃত বাণী দ্বারা, বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলতেন। আবু দাউদ র.তাঁর  সুনান গ্রন্থে মিকদাম ইবনে মা‘দিকারুব রা. থেকে বর্ণিত করেন –নবী করীম সা.বলেন: “ সাবধান! আমি কুরআন করীম ও তাঁর সাথে অনুরূপ বাণী নিয়ে এসেছি”।  আল্লামা খাত্তাবী র. এর অর্থ করতে গিয়ে বলেন: আমাকে কিতাব আল-কুরআন দেয়া হয়েছে যা ওহী হিসাবে তিলাওয়াত করা হয়। এবং অনুরূপ বাণী নিয়ে এসেছি যা কুরআন কারীমের বর্ণনা স্বরূপ অর্থাৎ আমাকে অনুমতি দেয়া হয় তা ব্যাখ্যা করার জন্য যা আল্লাহর কিতাবে এসেছে।তাই তিনি আল্লাহর অনুমতি  ও দিকনির্দেশনায় কোন কিছুর হুকুম আম সা সাধারণ ঘোষণা করেন, কিছু খাস বা নির্দিষ্ট করেন, এর সাথে সংযোজন করেন, আল্লাহর কিতাবে যা এসেছে,তার হুকুম জারি করেন। কাজেই কুরআনের স্পষ্ট ভাষ্যের মত মহানবী সা.-এর ভাষ্যের উপরও আমল করা ওয়াজিব।  কুরআনুল কারীমের তাফসীরের ক্ষেত্রে নবী করীম সা.এর বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে: প্রথম: মুজমালের বর্ণনা দ্বারা: যেমন কুরআনে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত নামাজে প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্তের সময় নির্ধারণ এবং রাকআতের পরিমাণ ও পদ্ধতি বর্ণনা।এই প্রসঙ্গে নবীজী সা. বলেন: “ তোমরা নামাজ আদায় কর যেমনিভাবে আমাকে দেখছ আদায় করছি”। দ্বিতীয় মুশকিলের ব্যাখ্যা দ্বারা, যেমন কুরআনের বাণী: وَكُلُواْ وَاشْرَبُواْ حَتَّى يَتَبَيَّنَ لَكُمُ الْخَيْطُ الأَبْيَضُ مِنَ الْخَيْطِ الأَسْوَدِ مِنَ الْفَجْرِ  “তোমরা পানাহার কর যতক্ষণ পর্যন্ত না কাল রেখা থেকে ভোরের শুভ্ররেখা প্রকাশিত হবে”।  নবী করীম সা. এই আয়াতে উল্লিখিত শুভ্ররেখাকে দিনের আলো ও কাল রেখাকে রাতের অন্ধকার দ্বারা ব্যাখ্যা করেন।তৃতীয়ত: আমকে খাসকরণ দ্বারা: যেমন আয়াতে حَرَّمَ عَلَيْكُمْ الْمَيْتَةَ وَالدَّمَ  “তোমাদের উপর কৃত বস্তু ও রক্তকে হারাম করা হয়েছে”।  ইহা আম। নবী করীম সা. একে খাস করেছেন, মৃত টিড্ডিকে ব্যাতিক্রম ঘোষণা করে।অতঃপর তিনি বলেন: “আমারেদ জন্যে দু’টি মৃত  ও দু’ধরণের রক্তকে বৈধ করা হয়েছে, মৃত দু’টি হলো মাছ ও টিড্ডি এবং রক্তগুলো হলো কলিজা ও প্লিহা”। তেমনিভাবে: الَّذِينَ آمَنُوا وَلَمْ يَلْبِسُوا إِيمَانَهُمْ بِظُلْمٍ  এখানে ظُلْمٍ এর আর্থ শিরক।  চতুর্থত: মুতলাককে মুকাইয়্যিদ করণ: যেমন আল্লাহ পাক উত্তরাধিকার আইনের বিষয়ে বলেন: فَإِنْ كَانَ لَهُ إخْوَةٌ فَلِأُمِّهِ السُّدُسُ مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ   “অতঃপর যদি মৃত ব্যক্তির কয়েকজন ভাই থাকে, তবে মাতা পাবে ছয় ভাগের এক ভাগ-ওসীয়তের পর যে ওসীয়ত করে সে মৃত্যু বরণ করেছে।কিংবা তার আদায় করার পর কৃত ঋণ পরিশোধের পর”।  আয়াতে মুতলাক (শর্তহীন) ওসীয়তকে হাদীস দ্বারা দু’টি দিক থেকে মুকাইয়্যিদ (শর্তযুক্ত) করা হয়েছে।ক. হাদীস শরীফে এসেছে মহানবী সা. এক-তৃতীয়াংশের বেশী ওসীয়ত করতে নিষেধ করেছেন।ইমাম মুসলিম রা. মাসআব ইবনে সা’দ রা. থেকে তিনি তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, “রসূলে পাক সা. আমার নিকট আসলেন, আমি তাঁকে বললাম, আমার সকল সম্পদ আমি ওসীয়ত করে দেই। নবীজী সা.বললেন, না।তারপর বললাম , অর্ধেক সম্পত্তি ওসীয়ত করি। তিনি বললেন না। তারপর বললাম এক-তৃতীয়াংশের কথা বললে তিনি বললেন, হাঁ। কেননা এক তৃতীয়াংশই অধিক।  খ.উত্তরাধিকারীদের জন্য ওসীয়ত নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন।‘ইমাম আবু দাউদ র. আবু উমামা হতে বর্ণনা করেন- তিনি বলেন: আমি শুনেছি নবী করীম সা. বলেছেন: আল্লাহ পাক প্রত্যেকের জন্যে নির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণ করে রেখেছেন। কাজেই উত্তরাধিকারীদের জন্যে কোন ওসীয়ত নেই।  পঞ্চমত:  শব্দ বা তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়ের অর্থ বর্ণনা দ্বারা:উদাহরণ স্বরূপ সূরা ফাতিহার الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ  দ্বারা ইয়াহুদী ও الضَّالِّينَ দ্বারা নাসারাদের উদ্দেশ্য করা। যেনম আহমদ ও তিরমিজী আদী ইবনে হাতিম রা. হতে বর্ণনা করেন তিনি বলেন নবী করীম সা.বলেছেন: নিশ্চয়ই الْمَغْضُوبِ عَلَيْهِمْ  হলো ইয়াহুদী সম্প্রদয়, আর الضَّالِّينَ হলো নাসারা খ্রিস্টান সম্প্রদয়।   এমনিভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যাখ্যায়  তার ভুমিকা হিসেবে নি¤েœাক্ত আয়াতটি উল্লেখ করা যায়। যাতে এসেছে ولھم ازواج مطھرۃ “ আর তাদের জন্য পবিত্র স্ত্রী সকল রয়েছে।  এ আয়াতে পবিত্রার ব্যাখ্যায় মহানবী সা. বলেন,পেসাব পায়খানা রজঃ¯্রাব, প্রসবোত্তর স্রাব প্রভৃতি হতে পবিত্র হবে।  ষষ্ঠত: নসখের বর্ণনার দ্বারা: যেমন রসূলুল্লাহ সা.কখনো কখনো আল্লাহর দিকনির্দেশনা বর্ণনা করেছেন, অমুক আয়াত অমুক আয়াত দ্বারা রহিত বা অমুক হুকুম অমুক হুকুম দ্বারা রহিত হয়েগেছে। কাজেই  নবীজী সা. এর বাণী“ওয়ারিসের জন্য ওয়াসিয়ত নেই”। এবং ওয়ারিসের আয়াত দ্বারা পিতা-মাতা ও আত্মিয়-স্বজনের জন্য বর্ণিত ওয়াসিয়তের আয়াতের হুকুমকে রহিত করে দেয় এবং তিলাওয়াত বাকি থাকে। আল্লাহ পাক বলেন: كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ إِن تَرَكَ خَيْرًا الْوَصِيَّةُ لِلْوَالِدَيْنِ وَالأقْرَبِينَ بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ  “ আমি তোমাদের উপর ফরজ করে দিয়েছি যে, যখন তোমাদের কারুর সামনে মৃত্যু হাজির হবে, তবে পিতামাতা ও রিকটস্থ আত্মীয়-স্বজনদের জন্য সঠিক ভাবে ওসীয়ত করে যাবে। আর খোদাভীরুদের উপর এটা দায়িত্ব বটে”।  ইবনে কাসীর রা. এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন: “ এর দ্বারা পিতা মাতা ও নিকটস্থ আত্মীয় স্বজনে ওয়াসীয়ত সাব্যস্ত হয় এবং বিশুদ্ধ মতে এটা  ওয়াজিব  ছিল মীরাসের আয়াত নাজিলের পূর্ব পর্যন্ত। আর যখন ফারাইজ সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হলো। তখন পূর্বের আয়াত রহিত হয়ে যায়। এবং প্রত্যেকের অংশ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত হয়ে যায়”।  আর তিনি প্রমাণ স্বরূপ নি¤েœাক্ত হাদীসটিও পেশ করেছেন। আবু দাউদ র. তাঁর সুনানে  আবু উমামা রা. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন আমি শুনেছি রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: আল্লাহ পাক প্রত্যেক প্রাপককে তার প্রাপ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। কাজেই ওয়ারিসের জন্যে কোন ওয়াসীয়ত নেই”।  সপ্তম: কুরআন কারীমের বর্ণিত হুকুমকে তাকীদ ও শক্তিশালী করা। আর তা তখন প্রযোজ্য হবে, যখন হাদীস শরীফে বর্ণিত হুকুম কুরআন কারীমের অনুরূপ হবে।, আর তার দৃষ্টান্ত হলো- যেমন ইমাম বুখারী র.বর্ণনা করেন-নবী করীম সা. বলেছেন: “ তোমরা স্ত্রীগণকে সৎ উপদেশ দিবে।কেননা তারা পাঁজরের হাড় দ্বারা সৃষ্টি। আর পাঁজরের হাড় খুবই শক্ত। কাজেই যদি তুমি তা সোজ করতে যাও তখন ভেঙ্গে যাবে।আর ঐ অবস্থায় রেখে দিলে ক্রমশ বক্র হতে থাকবে।কাজেই স্ত্রীগণকে সৎ উপদেশ দিবে”।   আর এই হাদীস খানা আল্লাহ  বাণী عاشروهن بالمعروف “ তাদের সাথে সৎবাবে জীবন-যাপন করবে”।  ্এর অনুরূপ।অষ্টমত: কুরআন কারীমের চেয়ে অতিরিক্ত হুকুম বর্ণনা দ্বারা। এপদ্ধতিতে যেমন কোন নারী ও তার ফুফু এবঅং কোন রমণী ও তার খানাকে একত্রে বিবাহ করা হারাম।কেননা কোরআন কারীমে শুধু দুই বোনকে একত্রে বিবাহ  হারাম করা হয়েছে। যেমন আয়াতে কারীমে: وَأَنْ تَجْمَعُوا بَيْنَ الْأُخْتَيْنِ إِلَّا مَا قَدْ سَلَفَ “ তোমরা দুই বোনকে একত্রিত করো না।তবে পূর্বে যা হয়েছে তা ব্যতীত”।   আর নি¤েœাক্ত হাদীসটি অতিরিক্ত হুকুমটি সাব্যস্ত করেছে। যেমন-  হযরত আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রসূলুল্লাহ সা. বলেছেন: “ তোমরা রমণী তার ফুফু এবং তার খালাকে একত্রে বিবাহ করো না”।  এর এমনিভাবে আল্লাহর বাণী: حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى “ তোমরা নামাজকে রক্ষণাবেক্ষণ করবে বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাযকে”   এখানে নবীজী সা. মধ্যবর্তী নামাজ বলতে আসরের নামাযকে বুঝানো হয়েছে।অনুরূপ ভাবে সাদাকাতুল ফিতর, বিবাহিত পুরুষের  যিনার শাস্তির রজম, দাদীর সম্পদ, শফতের হুকুম ইত্যাদি যা বিভিন্ন গ্রন্থে পাওয়া যায়। মহানবী সা. তা ব্যাখ্যা করেছেন।এভাবে নবী করীম সা. কুরআন কারীমের তাফসীর করতেন।আল-কুরআন সংরক্ষণ ও  ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের  যিম্মাদারী স্বয়ং আল্লাহ পাক নিয়েছেন।যে জন্যে দেখা যায়, আল-কুরআনে কোন একটা দিক কোন স্থানে সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলে অন্য স্থানে তা স্পষ্ট করে দেয়া হয়। এর পাশাপাশি স্বীয় নবী করীম সা. কেও কুরআন বোঝার মত প্রজ্ঞা  ও মেধা দেয়া হয়েছিলো । কেননা তিনি কোনআনের শিক্ষক হিসেবে অবিহিত, যা এমন কি স্বয়ং সে কুরআনেই ঘোষণা করা হয়েছে। তাই আবশ্যই ধরে নিতে হবে, যে , মহানবী সা. সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিতভাবে গোটা আল-কুরআনের বিষয় বস্তু বুঝতেন।এমনিভাবে সাহাবায়ে কিরাম ও বিস্তারিতভাবে না হলেও মোটামুটিভাবে সে কুরআনের ব্যহ্যত হুকুম সমূহ  হ্দৃয়ঙ্গম করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এবং যে সকল  বিষয় অনুধাবন করা কঠিন হয়ে পড়ত সাহাবায়ে কিরাম রা. সে সকল বিষয়ে নবীজীর শরণাপন্ন হয়ে জেনে নিতেন। এভাবে হুযুরে পাক সা. এর যুগে তাফসীরের উৎপত্তি ঘটে এবং সাহাবীগন কুরআনের সে সকল বিষয় বোঝার প্রয়োজন অনুভব করতেন রাসূলূল্লাহ সা.  তা ব্যাখ্যা করে দিতেন।

ক্রমবিকাশ

   পূর্বেই বলা হয়েছে যে তাফসীর সাহিত্যের ক্রমবিকাশ ঘটতে থাকে মহানবী সা.এর পর থেকে। কিন্তু পরবর্তী সময় থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময়ে বিশেষ বিশেষ দিক প্রাধান্য লাভ করে। যা সময়ের বৈশিষ্ট  হিসাবে পরিগণিথ হওয়ার যোগ্য।সে অনুসারে তাফসীরের ক্রমবিকাশ ধারাকে প্রাধানত তিনটি পর্বে ভাগ করা যায়।প্রত্যেক যুগের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট রয়েছে। সে যুগ তিনটি নি¤œরূপঃ ক. মৌখিক বর্ণনার যুগ: এটা মহনবী সা.এর সময় থেকে নিয়ে তাবঈগণের যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। এ সময়ে কিছু কিছু সংকলন থাকলেও মৌখিক বর্ণনার ধারাটা বেশী প্রধান্য পায়। যা ঐযুগের  একটা বৈশিষ্টে রূপ নেয়।(এর বিস্তারিত আলোচনা পৃথক অধ্যায়ে আসছে)খ. সংকলন যুগ: তাফসীর সংকলনের যুগ ব্যাপকভাবে শুরু উমাইয়া যুগের শেষ  ও আব্বাসী যুগের প্রথম দিকে।এ সময়ে সংকলন কর্ম এতই ব্যাপক হারে হতে থাকে যে,তা ঐ সময়ের জন্য বিশেষ বৈশিষ্টে রূপ নেয়।তার পর বিস্তৃত হয়ে আছে উনবিংশ শতাদ্বী  তথা শয়খ মুহাম্মদ আব্দুহু এর চিন্তাধারায়, নব্য চেতনার অবির্ভাব দ্বারা আধুনিক যুগে তার স্বকীয়তা নিয়ে পদার্পন  করা পর্যন্ত। (এর বিস্তারিত আলোচনা পৃথক অধ্যায়ে আসছে) গ.  আধুনিক যুগ: যুগ হিসাবে কোনটা প্রাচীন  কোনটা আধুনিক নয়।কেননা আজকে যাকে আধুনিক বলা হয়েছে আগত সময় বা যুগ হিসেবে তাও প্রচীন।তবে খ্রিস্টীয় উনবিংশ শতাব্দী মাঝামাঝি সময়কাল থেকে নিয়ে আজ একবিংশ শতাব্দী অবধি সময়কাল বোঝাতে ‘আধুনিক’ শব্দটি বহুল প্রচলিত। তাছাড়া আধুনা জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তির উৎকর্ষ, তথা শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে তাফসীর  সাহিত্যে নবতর উৎকর্ষ এসেছে। সে যুগকে চিহ্নত  করার লক্ষ্যে অধিক খ্যাত  ‘আধুনিক’শব্দটিকে বেশি উপযোগী বলে মনে হয়।পাশ্চাত্যের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রভাব , সমামজ -সাহিত্য  কেন্দ্রিক তাফসীর , জীবন মসম্যা সমাধানের বিভিন্ন দিকে বিষয়ভিত্তিক তাফসীরের প্রধান্য , সংক্ষেপেণমূলক প্রবণতার আধিক্য , ইত্যাদি দিক দিক আধুনিক যুগের তাফসীরকে বৈশিষ্ট ভূষিত করেছে। (এর বিস্তারিত আলোচনা পৃথক অধ্যায়ে আসছে)।

মৌখিক বর্ণনার যুগ

রাসূল সা.এর যুগে তাফসীর চর্চা: রাসূল সা. এর উপর কুরআন মাজীদ নাযিল শুরু হয় ৬১০ খ্রিস্টাব্দে।তিনি ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে ইন্তিকাল করেন।এই সময়ের মধ্যে তার উপর কুরআন মাজীদ নাযিল সম্পন্ন হয়। কুরআন মাজীদের আয়াত ও সূরা সমূহ বিশ্লেষণ করে তাফসীরকারগণ ও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন যে, এর অধিকাংশ সূরা ও আয়াত নাযিল হয়েছে উদ্ভূত বিভিন্ন সমস্যা সমাস্য সমাধানের লক্ষ্য নিয়ে। অবশিষ্ট সূরা ও আয়াতসমূহে মানবজাতির জন্য  অত্যাবশ্যক হিদায়ত বিবৃত  হয়েছে।কুরআন মাজীদের ভাষা আরবী এবং এটি আরবী ভাষাভাষী লোকদের নিকট প্রেরিত হয়েছিলো যে কারণে কুরআন মাজীদ তেলাওয়াত করেই এর প্রাথমিক হিদায়ত  লাভ করা সমকালীন লোকদের পক্ষে সম্ভব ছিল।তারপরও কোথাও যদি কোনো দূর্বোধ্যতা বা রহস্যময়তা থেকে থাকে, তা ব্যাখ্যা করার জন্য স্বয়ং রসূল সা. প্রস্তুত ছিলেন।ফলে তাঁর জীবদ্দশায় সাহাবা বা অন্য কারো কুরআন মাজীদের তাফসীর করতে হয়নি। বা করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি। বরং সলকেই প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যাটি রসূল সা.এর নিকট থেকেই শুনতে আগ্রহী ছিলেন।এ কারণে রসূল সা.এর জীবদ্দশায় কুরআন তাফসীরের অন্য কোন ধারা প্রত্যক্ষ করা যায় না। বরং মহানবী সা.ই এককভবে এর ব্যাখ্যা দেয়ার কাজে লিপ্ত ছিলেন।বস্তুত এটি তাঁর নবুয়্যতী দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল।যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন: ) مَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ وَاللَّهُ يَعْلَمُ مَا تُبْدُونَ وَمَا تَكْتُمُونَ  “ আল্লাহর বাণী প্রচার করা ছাড়া রসূলের কোন দায় নেই”।তোমরা যা প্রকাশ করো বা গোপন কর আল্লাহ  তা জানেন” (সূরা মায়েদা:৯৯) مَا أَنْزَلْنَا عَلَيْك الْقُرْآنَ لِتَشْقَى إلَّا تَذْكِرَةً لِمَنْ يَخْشَى “ আমি আপনাকে কষ্ট দেয়ার জন্যে  কুরআন নাযিল করিনি।বরং কুরআন নাযিল করেছি এ কারণে যে আপনি এর মাধ্যমে এক ব্যক্তিকে উপদেশ দিতে পারেন যে ভয় করে”। (সূরা ত্বহা:২-৩) مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى (২) وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى “ তোমাদের সাথী (মুহাম্মদ সা.) পাগল নন, পথভ্রষ্টও নন।তিনি মনগড়া কথা বলেন না”। (সূরা নযম: ২-৩)কুরআন মাজীদের আয়াতের বাইরে রসূল সা. যেমস্ত কথা বলেছেন  সেগুলো হাদীস হিসেবে খ্যাত লাভ করেছে।স্বভাবিক ভাবে তাই বলা হয়।হাদীস হলো কুরআন মাজীদের তাফসীর । কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা’আলা মূলনীতি বর্ণনা করেছেন , হাদীসে রসূল সা. সে মূলনীতি বাস্তবায়নের পথ ও পদ্ধতি নির্দেশ করেছেন। যে কারণে প্রতীমান হয় মহানবী সা. এর যুগে কুরআন মাজীদের তাফসীর হয়েছিলো , তবে তা হয়েছিলো  সমকালীন জীবনযাত্রার চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা পূরণের জন্য।পরবর্তী উদ্ভূত নানা সমস্যা সমাধানে কুরআন মাজীদের মূলনীতি কীভাবে কার্যকর করা হবে সে জন্য পরবর্তীকালেও তাফসীরের এ ধারা অব্যহত রাখা  আবশ্যক হয়ে পড়ে।

সাহাবা রা.এর যুগে তাফসীর চর্চা

মহানবী সা.এর ইন্তিকালে পর সাহবীগণের মধ্যে অনেকেই তাফসীর করেছেন। তাঁরা তাঁদের তাফসীরে বিভিন্ন  উৎস ব্যবহার করতেন।সাহাবীগণের তাফসীরের উৎসসমূহ: প্রথমত কুরআন কারীম: কেননা এর একটি আয়াত অন্য আয়াতের ব্যাখ্যা স্বরূপ। দ্বিতীয়ত সুন্নাতে রাসূল সা.: সাহাবীগণ যখন কুরআনে কারীমে কোন ব্যাখ্যা পেতেন না, তখন তাঁরা নবী করীম সা. এর বাণী দ্বারা  তাফসীর করতেন। কেননা তাঁরা সর্বদা নবীজীর কাছে থাকতেন , উপলব্ধি করার চেষ্টা  করতেন। আর নবীজীর চরিত্রই ছিল গোটা কুরআন মাজীদের ফলিত দিক। হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত وکان خلقہ القران    “ তাঁর জীবনচরিত আল-কুরআন”। তৃতীয়ত, তাঁদের ইজতিহাদ তথা গবেষণা: সহাবাগণ যখন কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা কোন তাফসীর করতে সক্ষম হতেন না, তখন তাঁরা ইজতিহাদ দ্বারা তাফসীর করেন।তাঁদের গবেষণা  পদ্ধতি ছিল নিম্পরূপ: ১.  আরবী ভাষার জ্ঞান ও পা-িত্য: ভাষার ব্যুতপত্তিগত ও বাগধারাগত রহস্য সম্পর্কে জ্ঞাত  হওয়া তথা আরবী ভাষায় গভীর জ্ঞান লাভ ও তার অনুধাবন এবং প্রয়োগের মাধ্যমে। ২. জাহেলী যুগের আরবী কবিত: কখনও আবার ইসলাম পূর্ব জাহেলী যুগের কবিতা সম্বন্ধে জ্ঞাত হওয়ার মাধ্যমে। যেমন হযরত উমর ও ইবনে আব্বাস রা. করেছেন।৩. আরববাসীদের জীবন যাত্রার পদ্ধতি: তথা স্বভাব-প্রকৃতি, আচার -আচরণ ও প্রথা সম্বন্ধে প্রচলিত ধারণার মাধ্যমে। যেমন আল্লাহর বাণী: وَلَيْسَ الْبِرُّ بِأَنْ تَأْتُوْاْ الْبُيُوتَ مِن ظُهُورِهَا “ তোমাদের ঘরের পিছনের দিক দিয়ে প্রবেশ করায় কোন পুণ্য নেই”।  এই আয়াতের উদ্দেশ্য কেউ উপলদ্ধি করতে পারে না । যদি তিনি সে আয়াতটি অবতীর্ণ  হওয়ার সময় আরবদের প্রথা সম্বন্ধে সম্যক অবহিত না হন। ৪. কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময় আরব উপদ্বীপের বসবাসরত ইয়াহূদী-খ্রিস্টানদের সম্পর্কে যথাযথ অবগরিতর মাধ্যমে: এজন্য দেখা যায় হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. সহ অনেকেই হযরত কা’ব  আল-আহবার, আব্দুল্লাহ  ইবনে সালাম রা.প্রমুখের নিকট থেকে আরব উপদ্বীপে বসবাসরত ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের সম্পর্কে যথাযথ অবগতির জন্য উপস্থিত হতেন।ত’ছাড়া  সাহাবীগণ রা. মদীনায় হিজরত করার পর ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের সংস্পর্শে আসেন। তাদের সাথে উঠ-বসার মাধ্যমেও সাহাবীগণের অনেক ধারণা সৃষ্টি হয়।৫. শানে নুযূল তথা অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ও পেক্ষাপট সম্বন্ধে জ্ঞাত হওয়ার মাধ্যমে:  আল্লামা ওয়াহিদী বলেন: আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার কারণ জানতে না পারলে কারো জন্য আয়াতের তাফসীর কর সম্ভব নয়।  ইবনে দাকীক আল ঈদ র. বলেন শানে নুযূল হলো কুরআনের অর্থ উপলব্ধি করার শক্তিশালী মাধ্যম।ইবনে তাইমিয়া র. বলেন: শানে নুযূল জানা থাকলে তা কুরআনের আয়াত অনুধানের সহায়ক  হবে।কেননা কোন বিষয়ে উপলক্ষে জানা থাকলে সে বিষয়টা সম্পর্কে ধারণা জন্ম নেয়। এজন্য সাহবীগণ রা. তাফসীরের ক্ষেত্রে শানে নুযূলের উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করতেন।এর উপর নির্ভর করতেন। আর তাঁরা তো ঘটনাবলীর প্রত্যক্ষ সাক্ষী, আল-কুরআন নাযিলের সাথে সাথেই তাদের জীবস যাত্রা পরিবর্তন করছিলেন।৬. বোধশক্তি ও গভীর উপলব্ধি করার ক্ষমতার মাধ্যমে  আলী রা.কে যখন প্রশ্ন করা হলো, “ কিতাবুল্লাহে যা আছে তাছাড়া আপনার কাছে মহানবী সা.এর কাছে আসা কোন ওহী আছে কি? তখন তিনি বললেন, না যিনি শস্য দানা সৃষ্টি করেন ও মানুষ তৈয়ার কনে তাঁর শপথ!কুরআন কারীমে নিবিড়  মনোনিবেশকারীকে আল্লাহ পাক যে বোধশক্তি দেন তা ছাড়া আর কিছুই নেই আমার কাছে।  আর সাহাবীগণের মধ্যে বোধশক্তি ও উপলব্ধি ক্ষমতায় ব্যবধান ছিল।


আপনার মন্তব্য লিখুন


Graveter Image

নাম

April 12